তোলপাড় (চতুর্থ অধ্যায়) (শওকত ওসমান)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - চারুপাঠ - গদ্য | NCTB BOOK
3.4k

একদিন বিকেলে হন্তদন্ত সাবু বাড়ির উঠান থেকে 'মা মা' চিৎকার দিতে দিতে ঘরে ঢুকল। জৈতুন বিবি হকচকিয়ে যায়। রান্নাঘরে পাক করছিল সে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে শুধায়, কী রে-এত চিক্কর পাড়স ক্যান?

  • মা, ঢাকা শহরে গুলি কইরা মানুষ মারছে-
  • কে মারছে?
  • পাঞ্জাবি মিলিটারি।

দেখা যায় সাবু খুব উত্তেজিত। মুখ দিয়ে কথা তাড়াতাড়ি বের করে দিতে চাইলেও পারে না। কারণ, শরীর থরথর কাঁপছে। হাতের মুঠি বারবার শক্ত হয়।

  • মা, একজন দুজন না। হাজার হাজার মানুষ মারছে।
  • কস কী, হাজার হাজার?
  • হ, সব মানুষ শহর ছাইড়া চইলা আইতেছে।

ঢাকা শহর থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরবর্তী গাবতলি গ্রাম। কিন্তু যাতায়াতের সুবিধা নেই। তাই সব খবরই দু- দিন বাদে এসে পৌঁছায়। এবার কিন্তু তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। পরদিনই পাওয়া গেছে সব খবর। যারা জওয়ান তারা সোজা হেঁটে হেঁটে বাড়ি পৌঁছেছে। তাই খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় নি। পঁচিশে মার্চের রাত্রে পাঞ্জাবি মিলিটারি ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবন্ত যাকে পাচ্ছে তাকেই হত্যা করছে।

পরদিন সাবুর সামনে গোটা শহর যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তাদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে জেলা বোর্ডের সড়ক। সেই পথে মানুষ আসতে লাগল। একজন দুজন নয়, হাজার হাজার। একদম পিলপিল পিঁপড়ের সারি। গাবতলি গ্রাম তাদের গন্তব্য নয়। আরও দূরে যাবে তারা। কেউ কুমিল্লা, কেউ নোয়াখালি, কেউ ময়মনসিংহ-একদম গারো পাহাড়ের কাছাকাছি, আরও নানা এলাকায়।
দারুণ রোদ্দুর মাথার উপরে। আর ভিড়। নিশ্বাসে নিশ্বাসে তাপ বাড়ে। হাঁটার জন্য ক্লান্তি বাড়ে। সব মিলিয়ে জওয়ান মানুষেরাই খাবি খাচ্ছে। মেয়ে, শিশু এবং বেশি বয়সীদের তো কথাই নেই। ক্ষুধার কথা চুলোয় যাক, পিয়াসে ছাতি ফেটে দুতিন জন রাস্তার ধারেই শেষ হয়ে গেল।

জৈতুন বিবি মুড়ি ভেজে দিয়েছিল খুব ভোর-ভোর উঠে। সাবু চাঙারি বোঝাই করে মুড়ি এনে ওদের খাইয়েছে। নিজেরা কীভাবে চলবে সে কথা ভাবে নি। মুড়ি শেষ হলে সে পানি জোগানোর কাজে এগিয়ে গেছে।
এক প্রৌঢ় নারীকে দেখে সে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। পঞ্চাশের বেশি বয়স! কিন্তু কী ফরসা চেহারা! যেন কোনো ধলা পরি। মুখ দেখে বোঝা যায় অনেক হেঁটেছেন, অথচ তার জীবনে হাঁটার অভ্যেস নেই। সাবুর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

  • মা, পানি খাবেন?
  • দাও, বাবা। প্রৌঢ় নারী মুখ খুললেন। গ্লাস আবার ধুয়ে জালা থেকে পানি এগিয়ে দিয়েছিল সাবু। খালি গা। পরনে হাফপ্যান্ট, তাও ময়লা। বড় লজ্জা লাগে সাবুর। প্রৌঢ়া পানি খেয়ে তৃপ্ত। হাতে চামড়ার উপর নকশা-আঁকা ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন। তারপর একটা পাঁচ টাকার নোট সাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, বাবা, তুমি কিছু কিনে খেও।
  • এ কী! না-না-
  • নাও, বাবা।
  • মাফ করবেন। টাকা নিলে আমারে মা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিব। আমারে কইয়া দিছে, শহরের কত গণ্যমান্য মানুষ যাইব রাস্তা দিয়া! পয়সা দিলে নিবি না। খবরদার। সেই প্রৌঢ় নারী একটু হাঁফ ছেড়ে বললেন, তোমার মা কিছু বলবেন না।
  • আমার মা-রে আপনি চেনেন না। মা কন, বিপ পইড়া মানুষ বাড়ি আইলে কিছু লওয়া উচিত না। গরিব হইতাম পারি, কিন্তু আমরা জানোয়ার না। শেষ কথাগুলোর পর নিরুপায় সেই নারী সাবুর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, বাবা, যদি কখনো ঢাকা শহরে যাও, আমাদের বাড়িতে এসো।
  • আপনাদের বাড়ি?
  • লালমাটিয়া ব্লক ডি। আমি মিসেস রহমান।

মিসেস রহমান আবার রাস্তা ধরলেন। সাবু বুঝতে পারে, এই গরমে হাঁটার পক্ষে মোটা শরীর আদৌ আরামের নয়। বেচারা নিরুপায়। শরীর তো আর নিজে তৈরি করেন নি। তিনি নিমেষে ভিড়ে মিশে গেলেন। ভিড় নয় স্রোত। শহর থেকে যে শুধু গণ্যমান্য মানুষ আসছে, তা নয়। সাধারণ মজুর-মিস্ত্রিরা পর্যন্ত আসছে। সাবু ভাবে, তা হলে শহরেও গরিব আছে, যারা তাদের মতোই কোনো রকমে দিন কাটায়, তাদেরই মতো যাদের ঠিকমতো বিশ্রাম জোটে না, আহার জোটে না, কাপড় জোটে না। এই সময় সাবুর আরো মনে হয়, একবার শহর দেখে এলে হতো। লোক তো শহর পর্যন্ত আছেই। এই জনস্রোত ধরে উজানে ঠেলে গেলেই সেখানে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু তার সাহস হয় না।
একদিন তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে গেল আট-নয় জনের একটি পরিবার। সম্ভ্রান্ত জন তারা। সত্তর বছরের বুড়ো তাদের সঙ্গে। তিনটি মাঝ-বয়সী মেয়ে-ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স- তাকে ধরে ধরে আনছে। সঙ্গে আরো পাঁচ-ছয়টি কুঁচো ছেলেমেয়ে, কেউ আট বছরের বেশি নয়। আর আছে লুঙ্গি পরা হাফ শার্ট পরিহিত জওয়ান একজন। তার চেহারা জানান দেয় বাড়ির চাকর। বুড়ো ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। কখনো মেয়ে তিনটির সাহায্য নেয়, কখনো জওয়ান চাকরের! পাঁচ-ছটি কুঁচো ছেলেমেয়ের খবরদারিও সহজ নয়। কাজেই এই কাফেলা রীতিমতো নাজেহাল। আকাশে তেমনি কাঠফাটা রোদ।
শোনা গেল, বুড়োর তিন ছেলেকেই তার সামনে পাঞ্জাবি মিলিটারিরা গুলি করে মেরেছে। সঙ্গী মেয়ে তিনটি বিধবা বউ। কুঁচো ছেলেমেয়েগুলো বুড়োর নাতি-নাতনি।
গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে তারা বসেছিল। খবর জানার কৌতূহলে গাবতলি গাঁয়ের অনেকে ছুটে আসে। আজ কিন্তু কাছে এসে সবাই মিলে যায়। সদ্য বিধবা তিনজন। আর সঙ্গে অমন জয়িফ মানুষ। কেউ মিলিটারির জুলুমের খবর জানবার জন্য আগ্রহ দেখায় না। বরং কীভাবে এদের সাহায্য করতে পারে, তাই জিজ্ঞাসা করে।

বুড়ো ভদ্রলোক রাজি ছিল না। তবু কয়েকজন উপযাচক হয়ে বিভিন্ন ভার নিল। সাবুও বাদ গেল না। সে একটা কচি ছেলেকে কোলে তুলে নিল। দুই মাইল দূরে নদীর ঘাট। সবাই মিলে পালা করে কাঁধে নিয়ে বুড়ো মানুষটিকে নদীর ঘাট পর্যন্ত দিয়ে আসবে। তারপর নৌকায় তুলে দেবে।
সাবুর কোলে গোলগাল বাচ্চাটা। বছর তিন বয়স। বেশ ভারি। কিন্তু ক্লান্তি নেই সাবুর। মাঝে মাঝে অন্য কেউ তার বোঝা হালকা করতে চাইলে সে বলে, আর একটু আগাইয়া দেই।
বৃদ্ধ আশেপাশের বাহকদের বলে, তোমরাই আমার ছেলে, বাবা। এই গরমে তোমরা ছাড়া কে আর এমন সাহায্য করত। ছেলে আর কোথায় পাব-
কথা শেষ হয় না, ফোঁপানির শব্দ ওঠে।
আবার বুড়োর ভাঙা ভাঙা গলা শোনা যায়, জীবনে নামাজ কাজা করি নি, বাবা। ইসলামের নাম নিয়ে বলল, পাকিস্তান হলে মুসলমানদের মঙ্গল হবে। হা- এই বয়সে সব ছেলেদের হারিয়ে-বুড়ো কথা শেষ করতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় শুধু।

সমস্ত কাফেলা নীরব। নারীদের মধ্যে একজন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করেছিল। তখনই থেমে গেল। কে আর কথা বলবে এমন জায়গায়। মনে হচ্ছিল, কতগুলো লাশ নিয়ে যেন সবাই হাঁটছে।
সাবু কল্পনার চোখে যেন সামনে দেখতে পায়:
খাকি উর্দি পরা কতগুলো সিপাই তার সামনে। আর সে তাদের লাথি মেরে মেরে ফুটবলের মতো গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অসীম আক্রোশে তার রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। সেই সব দুশমন কখনও দেখে নি সে। সেই সব জানোয়ার কখনও দেখে নি সে, যারা তার দেশের মানুষকে বন্যার দিনের পিঁপড়ের মতো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জুলুমের দাপটে।
অমন জন্তুদের মোকাবিলার জন্য তার কিশোর বুকে আশ্চর্য তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।

Content added || updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

সোনাকান্দা
গাবতলি
পাহাড়তলী
সোনাপুর

শব্দার্থ ও টীকা

310

চিক্কর - চিৎকার। উচ্চ স্বরে কান্না।
পাঞ্জাবি মিলিটারি - পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সৈনিক। পাকিস্তানি অন্যান্য সৈন্যদের সঙ্গে এরাও পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্মম হত্যাকান্ড চালিয়েছিল।
পঁচিশে মার্চ - ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ। এই তারিখের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালিদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ শুরু করে।
গারো পাহাড় - বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য এলাকা।
প্রৌঢ় - প্রবীণ। যৌবন ও বার্ধক্যের মাঝামাঝি বয়সের।
খাবি খাওয়া - বিপদে পড়ে নিতান্ত নিরুপায় বোধ করা। মরণাপন্ন হওয়া। অসহায় বোধ করা।
চাঙারি - বাঁশের তৈরি ডালা, ঝুড়ি বা টুকরি।
নিমেষে - চোখের পলকে।
কাফেলা - সারি বেঁধে চলা পথিকের দল।
জালা - মাটির তৈরি পেট মোটা বড় পাত্র।
নাজেহাল - হয়রান। পেরেশান। জব্দ।
জয়িফ - দুর্বল। হীনবল। বৃদ্ধ। জরাজীর্ণ।
অসয়োস্তি - অস্বস্তি। মনের অশান্তি।
কুঁচো ছেলেমেয়ে - ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।
উপযাচক - যে যেচে বা স্ব-উদ্যোগী হয়ে কিছু করে।
উর্দি - সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত পোশাক।

Content added By

পাঠের উদ্দেশ্য

238

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।

Content added By

পাঠ-পরিচিতি

234

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অত্যাচারের দৃশ্য দেখে একজন কিশোর কীভাবে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়-শওকত ওসমানের 'তোলপাড়' গল্পে তাই ব্যক্ত হয়েছে। কিশোর সাবু গাঁয়ের সড়কে শহর থেকে পালানো হাজার হাজার মানুষ দেখে অবাক হয়। অত্যাচারিত ও ক্লান্ত মানুষদের মুড়ি বা পানি পান করিয়ে সে সান্ত্বনা খোঁজে। সাবু দেখতে পায়, নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই শহর থেকে পালাচ্ছে। পাকিস্তানিরা নির্বিচারে সবাইকে হত্যা করছে বলে তারা সংবাদ পায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই নিষ্ঠুরতা অনুভব করে সাবু ক্ষুব্ধ হয়। শহরত্যাগী মানুষের অসহায়ত্ব ও দুঃখ-কষ্ট দেখে তার মন বেদনায় ভরে ওঠে। অত্যাচার মোকাবিলা করার জন্য তার কিশোর মন আন্দোলিত হয়ে ওঠে।

Content added By

লেখক-পরিচিতি

262

শওকত ওসমানের প্রকৃত নাম আজিজুর রহমান। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে ১৯১৭ সালে। দীর্ঘদিন তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তবে অধ্যাপনা-জীবনে প্রবেশ করার আগে তাঁর চাকরিজীবন ছিল বিচিত্র। শওকত ওসমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। ছোটদের জন্য তিনি যে সব গ্রন্থ লিখেছেন সেগুলো হচ্ছে: 'ওটন সাহেবের বাংলো', 'ডিগবাজি', 'মসকুইটো ফোন', 'তারা দুইজন', 'ক্ষুদে সোশালিস্ট', 'ছোটদের নানা গল্প', 'কথা রচনার কথা', 'পঞ্চসঙ্গী' ইত্যাদি। তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পুরস্কারগুলো হচ্ছে: আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার ইত্যাদি। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Content added By

কর্ম-অনুশীলন

287

বন্ধুরা চলো আমাদের এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় কী কী ঘটেছিল তা স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে জেনে নিই। তাঁদের অভিজ্ঞতাগুলো খাতায় লিখে রাখি। তারপর অভিজ্ঞতাগুলো সাজিয়ে একটি গল্প লেখার চেষ্টা করি।

চলো তাহলে গল্পটি লেখার চেষ্টা করি (এ জন্য আলাদা কাগজ ব্যবহার করতে পারি)।

ভোর রাতেই হাফিজ ভাই খবর নিয়ে এলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দু-এক দিনের মধ্যে গ্রামে হানা দিতে পারে। খবরটি শুনেই গ্রামে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া শুরু হলো।...
Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...